ত্যাগের মহিমায় মা!

0
166

নিলুফা আক্তার: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মা দিবস পালিত হয়। মাকে ভালোবাসার জন্য বিশেষ দিনের প্রয়োজন হয় না। তারপরও এই দিনে সন্তানেরা নানা ভাবে মাকে আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করেন।একজন মা আর তার সন্তানের যে ভালবাসা তা কোনকিছু দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। তবে, আজ আমি কিছু বাস্তব অনুভুতি আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।

তার আগে আমি নিরপেক্ষ একটা বিষয় সামনে আনছি।ধরুন, আপনার বাড়ির পাশে খোলা একটা জায়গা পড়ে আছে।ভাবলেন সেখানে একটা গাছ লাগাবেন।নিজের পছন্দ মতো একটা চারাগাছ লাগালেন।চারাগাছটা দিনে দিনে নিজের নিচের মাটিটা শক্ত করে একটু বড় হতে শুরু করলো। একটা সময় গাছটা এমন এক পর্যায়ে পৌছালো যে, একটু ঝড়েই তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, কারন গাছের শিকড়টা তখনও এতো শক্ত হয় নি যে, হাজার ঝড়েও সেটা মাটিকে আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাই আপনি গাছের সাথে একটা লাঠি বেঁধে দিলেন শক্ত করে গাছের সাপোর্ট হিসেবে।সাপোর্ট পেয়ে গাছটি তার শিকড় গজিয়ে তর তর করে বেড়ে উঠতে লাগলো। গরু ছাগল আর দুষ্টু মানুষের হাত থেকে রক্ষার জন্য গাছের চারদিক বেড়া দিয়ে দিলেন।সঠিক সময়ে সঠিক যত্ন পেয়ে গাছটি ডালপালা ছড়িয়ে এমন ভাবে বেড়ে উঠেছে যে এখন আপনাকে ছায়া দিচ্ছে, মনে প্রশান্তি এনে দিচ্ছে।

সময়ের সাথে সাথে গাছটারও এখন বয়স হয়ে গেছে।আগের মতো আর ফল নাই ছায়া নাই আপনার মনে সেই প্রশান্তি ও নাই। একদিন মনে হলো এটা হয়তো এখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে।অতিরিক্ত জায়গা দখল করে আছে।তাই হয়তো গাছটাকে কাটার সিদ্ধান্ত নিলেন।গাছটা অনেক পুরাতন আর মোটাসোটা বলে হয়তো ঘরের খুটি হিসাবে আর সৌখিন কিছু ফার্নিচার তৈরী করলেন। কি পাঠক গাছের কাহিনী পড়তে পড়তে টায়ার্ড হয়ে পড়েছেন?

এবার আমি আমার মূল বিষয়ে আসি।আপনি আপনার জীবনের খুব শুন্যতা বা বাড়ির একটা খালি জায়গা পূরন করার জন্য আপনার জীবন সঙ্গী নিয়ে এলেন।আপনার স্ত্রী আস্তে আস্তে আপনাকে সহ বাড়ির সবাইকে খুব আপন করে নিতে শুরু করলো।যখন সে সময়ের সাথে সাথে নিজের মতো করে তার স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রুপ দিতে শুরু করলো তখনই শুরু হলো নানা বাধা, ঝড় আর হতাশার সাগরে হাবুডুবু খাওয়া।কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হতে, ঠান্ডা মাথায় সব কিছু মেনে নেয়ার পরীক্ষা দিতে দিতে অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। এখন মাটির নিচে তার শিকড়টা শক্ত হয়ে গেছে।এখন আর মেয়েটি শুধুই আপনার বউ ই নয় সে এখন একজন মা হয়ে উঠেছে, আপনার সন্তানের মা। একটু ভাবুন তো যেই গাছটা ঝড়ে উপড়ে যাবে বলে আপনি লাঠি দিয়ে সাপোর্ট দিয়েছিলেন যাতে মাটিকে শক্ত করে আকড়ে ধরে গাছটা তার অবস্থান ঠিক রাখে, অথচ এই সাপোর্ট টা আপনি আপনার সন্তানের মাকে কি কখনো দিয়েছেন?? তাহলে হয়তো অনেক নব্য মায়েরা ডিপ্রেশন, ফ্রাস্টেশন এগুলা ফেস করতো না।

একটা সময় গাছটাকে যেন গরু, ছাগল বা দুষ্টু মানুষেরা নষ্ট করতে না পারে তাই সময় মতো চারপাশে বেড়া দিয়ে দিয়েছিলেন, এখনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আপনার বাচ্চার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আপনার স্ত্রীর চাকরী বাদ দেয়ালেন, বাইরে যাওয়া বন্ধ করলেন, মানে তাকে ২৪ ঘন্টায় বাচ্চার বেড়া হিসাবে ব্যবহার করলেন। যা একটা মা বাচ্চার জন্য এমনিতেই করে আবার কোন কোন সময় তাকে বাধ্য করা হয় করতে।

এখন আপনি নিশ্চিন্ত। আপনার বাচ্চা এখন সুষ্ঠু পরিবেশে এবং নিরাপদে বেড়ে উঠছে। ঐ গাছটার মতো এখন আপনার স্ত্রী আপনাদের ছায়া দিচ্ছে, নিরাপত্তা দিচ্ছে, আপনার মনে প্রশান্তি এনে দিচ্ছে। এভাবে দিন যাবে মাস যাবে বছর যাবে কিন্তু আপনি কখনোই আপনার সন্তানের মায়ের ভালো লাগার বা তার ইচ্ছা অনিচ্ছা এই সবের কোন খবরই নেয়ার প্রয়োজন মনে করবেন না। একজন মা তার সন্তানের জন্য কতটা কষ্ট সহ্য করতে পারে আর কত কিছু যে নিজের জীবন থেকে বাদ দিতে পারে তা লিখে বোঝানোর ক্ষমতা আমার এই কলমের নাই।

আমরা শিক্ষিত মায়েরা কখনোই এটা ভাবি না যে পড়াশুনা করেছি চাকরি করবোই। বরং এটাই ভাবি একজন আদর্শ মা হিসাবে শিক্ষার দরকার। আর এই আদর্শ মা হতে গিয়েই কেউ হয়তো চাকরি ছাড়ছি আবার কেউ চাকরি করছি।কিন্তু আফসোস এখানেই, আমি মা হয়ে বাচ্চার কথা চিন্তা করে কত বড় ত্যাগ করছি, তার সামান্য পরিমান ও যদি সহযোগিতার হাত টা পাওয়া যেত তাহলে হয়তো বাচ্চাদের কে আরও একটু সুস্থ পরিবেশে বড় করা যেত।

এরপরও একটা মা আশায় বুক বাধে, তার সন্তান একদিন বড় হবে, তার দুঃখ কষ্ট বুঝবে, তাকে ভালো রাখবে। কিন্তু এতোটাই স্বপ্নে বিভোর থাকে যে সে ভুলেই যাই, ঐ গাছটার মতো সেও একদিন সময়ের সাথে সাথে বৃদ্ধ হয়ে যাবে। আগের মতো আর ছায়া দিতে পারবে না, গাছটার মতো অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে, অতিরিক্ত জায়গা দখল করে থাকবে। তাই হয়তো মায়ের নতুন ঠিকানা হবে বৃদ্ধাশ্রম। আমার মনে হয় সন্তানের ভালোর জন্য মায়েরা হয়তো বৃদ্ধাশ্রম টাকে খুব হাশি মুখে গ্রহন করে নেন।

পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি আমার অনেক অনেক ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা।সব মায়েরা ভালো থাকুক তাদের নিজ নিজ ঠিকানায়।