বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ আমাদের বদ অভ্যাস!

0
192

একটু পিছনের দিকে ফিরে যায়? এই ১৯৫২ সালের কথাই বলি। তখন আমরা স্বাধীনভাবে আমাদের মাতৃভাষায় কথা বলতে পারতাম না। আর এই স্বাধীন ভাবে মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য সালাম, রফিক, জব্বার আরো অনেক ভাই শত্রæদের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল। অনেক রক্তের বিনিময়ে আমরা আমাদের মায়ের ভাষা ছিনিয়ে আনি। এখন আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনভাবে কথা বলছি। নিজের ভাষায় কথা বলা যে কত শান্তির তা কোন মানুষকেই আলাদা করে বোঝাতে হবে না।

একটা বাচ্চা যখন কথা বলতে শেখে তখন তার ছোট ছোট কথায় আমরা কতোটাই না খুশি হই। হোক না সেটা আধো-আধো। এমনি করে যখন সে আর একটু বড় হয় তখন ভালো বা মন্দ কোন কিছুই বোঝে না, তখন যা শুনে তাই বলতে থাকে, তাতেও আমরা খুব একটা অস্বস্থি ফিল করি না। ভালোই লাগে শুনতে।
এরপর শুরু হয় তার পুরোদমে কথা বলা। প্রথমে আমরা মনোযোগ দিই বাক্যগুলো যেন ঠিক থাকে। তারপর সুন্দর করে কথা বলা। তারপর কোথায় কি বলতে হবে, কি বলতে হবে না তা বোঝানো।
সম্যসাটা শুরু হয় তখনই। সমস্যাটা হল বাকস্বাধীনতা। বাকস্বাধীনতা হলো আপনি যা বলতে চান তাই অবলীলায় বলা। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন তো আমরা কয়জন পারি স্বাধীনভাবে কথা বলতে? যেমন:
১.আপনার বাচ্চা কারো সামনে বেফাস একটা কথা বলা শুরু করলো। আপনি সাথে সাথে তাকে থামিয়ে দিলেন। কারন আপনার সম্মানহানি হবে। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখলেন সে কোন চিন্তাধারা থেকে কথাটা বলছিল। আপনি তাকে থামিয়ে দিয়ে তার চিন্তাধারার ব্যাঘাত ঘটালেন তো বটেই সাথে সাথে তার মনের অবস্থাও বুঝতে ব্যর্থ হলেন। আপনি তার বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলেন নয় কি?
২.আবার অনেক সময় দেখবেন আপনি কোন জায়গায় আড্ডা দিচ্ছেন। সবাই একমতে কথা বলে না বা এক টাইপের থাকে না। সবার কথার মাঝে হয়তো আপনার কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। থেমেই যাচ্ছেন বলবেন কি আর বলবেন না। সুযোগটাই তো পাচ্ছেন না। যাওবা পাচ্ছেন আর একজন তা কেড়ে নিচ্ছে। এটা কি বাক স্বাধীনতা হস্তক্ষেপ নয়।
৩.ধরুন পরিবারের খুব গুরুত্বপূর্ণ মিটিং হচ্ছে, আপনিও তাদের মধ্যে একজন। আলোচনার মাঝে সবার মন্তব্য নেয়া হচ্ছে একে একে। আপনিও খুব মনে মনে সাজিয়ে রেখেছেন কি বলবেন। যেই আপনার পালা আসলো তখন অন্য কেউ একজন বলে উঠল আরে ও কি বলবে? এটা বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়।
৪.আবার আপনি জন মজলিসে একটা কথা খুব আগ্রহ সহকারে শুরু করলেন মাত্র। অমনি কেউ একজন ভরা মজলিসের মধ্যেই বলে উঠলো আরে তোর আক্কেল নাই এই সময় কেউ এই কথা বলে? এখানে “আক্কেল” টাকে ব্যবহার করা হলো ধারালো অস্ত্র হিসাবে, আর হরণ করা হলো আপনার বাক স্বাধীনতা।
৫.ঘরে বসে আপনার প্রিয় মানুষের সাথে কথা বলছেন, হঠাৎ আপনার ফোনে ফোন, হতে পারে সেটা আপনার ভাই বোন অথবা কোন শুভাকাঙ্খী আপনি তো মহাখুশি। অনেক ভালোবাসা নিয়ে কথা শুরু করলেন, কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগে আপনাকে এদিক থেকে চোখ রাঙাচ্ছে, ফোনটা রাখার জন্য। এখানে তীরের মত বুকে এসে বিধলো তার চোখ রাঙানো, খুন হলো আপনার ভালোবাসার কথাগুলো, এটা কি বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়।
.অনেক সময় দেখা যায়, আপনি ফোনে কথা বলছেন বেশ সময় নিয়ে। কথা বলা শেষ হতেই আপনাকে কে বলছে এত প্যাচাল পারো তুমি। এত কথা বলার কি দরকার? অল্পতেই রাখতে পারো না। কথা বললে আর ছাড়া ছাড়ির নাম নাই। এতো কথা বললে ওয়েট থাকে না। যাও,যাওবা মন ভালো হয়েছিল তাও শেষ হয়ে গেল এত কথার গুলিতে। মুর্হূত্বেই ব্যাথিত হলো আপনার ভালোলাগার অনুভূতিটার, এটাকি বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়।

ভাষার জন্য এত ভাইয়ের রক্ত দেয়া কি তাহলে বৃথ্যা হলো? স্বাধীনভাবে যদি কথা বলতে নাই পারি তাহলে কি লাভ স্বাধীন দেশে বেঁচে থেকে। আর আমরা যারা এই পরাধীনতার শিকার, কি লাভ বেঁচে থেকে? যেখানে মনের কথাটাও ভালোভাবে বলতে পারছিনা।
জি আপনাকেই বলছি, একটু ভেবে দেখুন, তো আপনি নিজেই এই বাকস্বাধীনতার শত্রæ কিনা? আমার বিশ্বাস এই শত্রæ প্রতি ঘরে ঘরেই আছে। কে লড়বে এর বিরুদ্ধে কি দিয়েই বা ঘায়েল করবে শত্রæদের? যদি নিজের বিবেককে না জাগ্রত করি?
একজন মানুষের মনকে ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার অধিকার আমাদের কারোর নাই। মূল্য দিতে হবে শিখতে হবে প্রিয় মানুষের মনটা কে?
একমাত্র আমার দেশেই যারা অবলীলায় ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন। যেখানে আমরা আমার প্রিয় মায়ের ভাষা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা। সেখানে কোন মতেই এই বাক পরাধীনতা মেনে নেয়া যায়না। শুধু একটু নিজের বিবেক আর প্রিয় মানুষের মনের মূল্য দিতে পারলেই আমরা জয় করতে পারি এই পরাধীনতা।

নিলুফা আক্তার
লেকচারার: AIBT
পার্টনার: touchshopbd 

গড়াইনিউজ/আরিফুজ্জামান
প্রকাশিত: বাংলাদেশ সময়: ০১.৩০ ঘন্টা, ২০২০।

একটি উত্তর ত্যাগ