বিএনপি’র এই নতুন কমিটিতে দুই যুদ্ধাপরাধী ও মানবতা বিরোধী রয়েছে

0
3004

গড়াইনিউজ২৪:: বিএনপি কি জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে জামায়াতি ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে? সম্প্রতি বিএনপির চেয়ারপারসনের দেওয়া বক্তব্যকে কি স্ববিরোধী মনে হয় না? কট্টর বিএনপি বিরোধীরাতো জানতে চাইতে পারেন, পাকিস্তানপন্থীরা কি বাংলাদেশ দখলের পায়তারা করছে? বিএনপি চেয়ারপারসন সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেছেন, জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে তারা যে কোনও ছাড় দিতে রাজি। সেই ছাড়টা যে জামায়াত ও পাকিস্তানবাদীদের ত্যাগ করা এমনটাই অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু শনিবার আমরা কী দেখলাম। বিএনপির জাতীয় কমিটি ঘোষণা হলো। জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশন হওয়ার সাড়ে চার মাস পর। দীর্ঘ স্থবিরতার কারণে সঙ্গত কারণেই মনে হচ্ছিল এই কমিটি অন্তত স্বচ্ছ হবে।  পাকিস্তানপন্থী এবং স্বাধীনতা ও মানবতা বিরোধীদের অনুগামীদের বাইরে রাখা হবে। কিন্তু সবাইকে হতবাক করে দিয়ে এই নতুন কমিটিতে দুই যুদ্ধাপরাধী ও মানবতা বিরোধীদের দুই সন্তানকে সাদরে ঢোকানো হয়েছে। বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদীন ফারুক শনিবার রাতে একটি টেলিভিশন চ্যানেলে বলেছেন, এই দুইজনতো একাত্তরে জন্মগ্রহণ করেননি। তারা একাত্তরে মানবতাবিরোধী ও স্বাধীনতা বিরোধী হয় কী করে? বিএনপিতে পদোন্নতিপ্রাপ্ত জনাব ফারুক তার দলের শীর্ষ নেতার বক্তব্যকেই পুনপ্রকাশ করলেন। কিন্তু দেশের কোটি মানুষ কি ভুলে গেছে, যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানদের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো। তারাতো প্রকাশ্যেই মুক্তিযুদ্ধকে কটাক্ষ করেছে, তারা তো দেশের সংবিধান, বিচার ব্যবস্থাকেও বৃদ্ধাঙ্গুলিও দেখিয়েছে।
চরম বাংলাদেশ বিরোধী ও মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন আব্দুল আলিম। যিনি যুদ্ধশেষে বন্দী হয়েছিলেন মানবতাবিরোধী কর্মসম্পাদনের কারণে। তারপর বিএনপিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আব্দুল আলিম পাকিস্তান পুনপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে গেছেন। আর আলিমপুত্র ফয়সাল বাবাকেই অনুসরন করেছেন। অন্তত তার সঙ্গে যাদের ওঠাবসা আছে তাদের মুখ থেকে এমনটাই জানা যায়। তাদের রাজনীতিতে আসাতো উত্তরাধিকার সূত্রেই। পাকিস্তান বাহিনীর কুখ্যাত দালাল ফজলুল কাদের চৌধুরীর সন্তান সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী রাজনীতি শুরু করেছেন বাবার পথ ও মতকে সঙ্গে করে এবং তারই জীবদ্দশায়। আব্দুল আলীমের পুত্রও রাজনীতিতে সুযোগ পেয়েছে বাবার কারণেই। সুতরাং বাবার অপকর্মকে সমর্থন ও তাকে ন্যায্য মনে করা সন্তানেরা কি সেই দুর্গন্ধ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারেন? বিএনপির রাজনীতি করেন এমন লোকতো জয়পুরহাটে আরও আছে। যাদের হয়তো দলে অনেক অবদানও আছে। তাদেরতো কেন্দ্রীয় কমিটিতে যুক্ত করা হয়নি। একবারে নতুন মুখ দলীয় আদালত কর্তৃক শাস্তিপ্রাপ্ত মানবতাবিরোধীদের সন্তানরা যদি বাংলাদেশকে স্বীকার করে সংবিধান ও দেশের বিচার ব্যবস্থাকে মেনে নিত তাহলে আজকে এই প্রশ্নের জন্ম হতো না। সুতরাং সেই প্রশ্নের জবাবওতো বিএনপিকেই দিতে হবে। জাতীয় কমিটি ঘোষণারও বহু আগে থেকে শোনা যাচ্ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীনকে দলে স্থান দেওয়া হবে। এটা বিএনপির সিনিয়ার অনেক নেতাও বলছিলেন। কিন্তু কোন কারণে তিনি বাদ গেলেন সেটাও ভেবে দেখতে হবে। এই প্রবীণ শিক্ষক সম্প্রতি জামায়াত ত্যাগের যে সুপারিশ করেছিলেন তারই খেসারত কি এটা নয়? বিএনপি প্রবীণ এই শিক্ষকের প্রতি আচরণ মাধ্যমে জানিয়ে দিল, জামায়াত-জঙ্গি -পাকিস্তান বিরোধীদের পরিণতি কী হতে পারে। এখন বাকি আছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জাফরুল্লাহ চৌধুরীর কী হয় তা দেখার। বিএনপিতে আগে থেকেই স্থান পাওয়া আরও কিছু অভিযুক্ত ব্যক্তি আছেন। তাদের কেউই স্থানচ্যুত হয়নি। কেউ কেউ আবার পদোন্নতিও পেয়েছেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য ওসমান ফারুকের একাত্তরের ভূমিকা শুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয়। তার তৎকালীন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তদন্তও চলছে। বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে  ৫৯২ জনের যে তালিকা প্রকাশ করেছে সেটিও তাদের গঠনতন্ত্রের বিরুদ্ধে। তাদের গঠনতন্ত্রে ৪৪৮জন সদস্য থাকার কথা থাকলেও বেশি কর্মী ও সমর্থককে খুশি করার জন্য চেয়ারপারসনের ইচ্ছা অনুযায়ী তা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম এই কমিটিকে ডায়নামিক বলে অবহিত করেছেন। অথচ এই কমিটিতে স্থান পাওয়া অধিকাংশকেই এযাবত কোনও আন্দোলনে দেখা যায়নি। এমনকি নতুন করে সালাউদ্দিন সাহেবকে স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন আছে। যে ব্যক্তি সম্পর্কে ২০১৩ সালে নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগ এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপি’র যেসব নেতা নিষ্ক্রিয় ছিলেন তাদের লম্বা তালিকা প্রকাশ হয়েছিল। সেই তালিকার প্রায় সবাই নতুন তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। আর সালাউদ্দিন সাহেবতো এক লাফে স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়ে গেলেন। বলা হয়, দলকে চাঙ্গা করার জন্য পরীক্ষিতদের নিয়ে নতুন কমিটি করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীর সন্তান ফয়সাল সম্পর্কেই যদি প্রশ্ন করা হয়- এই ব্যক্তি কি কখনও বিএনপির রাজনীতিতে সামান্য অবদানও রেখেছেন? তাহলে কি এটাই ধরে নিতে হবে না, ফয়সালের মতো ব্যক্তিদের দলে টানা হয়েছে বাংলাদেশ বিরোধী মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। বিএনপি এই কমিটি ঘোষণা মাধ্যমে দলের অবস্থানকে নড়বড়ে করেছে কী না তা দেখতে বোধ করি দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে না। বিএনপির সিনিয়র নেতারাও তাই সানন্দে গ্রহণ করেননি নতুন এই কমিটিকে। চেয়ারপারসনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলতেও শোনা যায় সেইজন্য। জয়নাল আবেদীন ফারুক সেদিনই টেলিভিশনে বলেছেন, তিনি একটা দল করেন তাই যা বলার চেয়ারপারসনকেই বলবেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হান্নান শাহ, মেজর জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানতো প্রকাশ্যেই নতুন কমিটির সমালোচনা করেছেন। এমন সিনিয়র নেতারা যখন নতুন কমিটিকে অপছন্দ করেন তখন মাঠ পর্যায়ে কী অবস্থা হতে পারে তা সহজেই অনমান করা যায়।  যুদ্ধাপরাধী ও মানবতা বিরোধীদের দলীয় নেতা কর্মী বানিয়ে তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে, এটাই তাদের অবলম্বন। আরেকটা প্রশ্ন- যে দলটি নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ হাসিলের জন্য নিজেদের গঠনতন্ত্রকে ছুড়ে ফেলতে পারে। সেই দলটি ক্ষমতায় যাওয়ার পর কি রাষ্ট্রের সংবিধানকেও পদদলিত করতে পিছপা হবে? আর পাকিস্তানের আদর্শের ধারকদের দল থেকে বের করে দেওয়ার পরিবর্তে তারা যখন মুসলিম লীগ পরিবারকে দলভুক্ত করে তখন সঙ্গত কারণেই মনে করা যায়, আসলে তারা পাকিস্তানকেই স্বাগত জানাচ্ছে। যে পাকিস্তান বাংলা উৎখাতের চেষ্টায় লিপ্ত স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই।

লেখক- সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।