আইএসের চোখে বিশ্বের সব দেশ আর সরকারই শত্রু

0
1448

ইরাক-সিরিয়াভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস বিশ্ব মানবতার শত্রু—এই হলো বিশ্বজুড়ে সাধারণ জনমত। এর বাইরের সাধারণ ধারণা হচ্ছে, আইএস তাদের প্রধান শত্রু মনে করে আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্রদেশগুলোকে, যারা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটা দেশে ভয়ানক যুদ্ধ বাধিয়েছে। রাশিয়াকেও আইএস শত্রু মনে করে। শত্রু মনে করে সৌদি আরব, ইরান, মিসর, ইরাক, সিরিয়া, জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশের সরকারকে। আইএস যদিও ইসরায়েলে কোনো হামলা এ পর্যন্ত চালায়নি বা চালাতে পারেনি, তবু ইসরায়েলকেও তারা প্রথম সারির শত্রুদের একটা বলে মনে করে। আসলে দেশ ও সরকারের কথা ভাবলে পৃথিবীর সব দেশের সব সরকারকেই তারা নিজেদের শত্রু বলে মনে করে। আমরা দেখি যে আইএসের শত্রু-তালিকায় যেমন সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিষ্টান ও ইহুদির দেশ আছে, তেমনি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশও আছে। এমনকি প্রায় শতভাগ মুসলমানের দেশও আছে। আইএসের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে সংগঠনটির রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও ধর্মীয় ভাবাদর্শের প্রতিফলন। রাজনৈতিক দিক থেকে তারা মনে করে, তাদের একমাত্র শত্রু গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। গণতান্ত্রিক সরকার, নির্বাচন, আইনসভা, বিচারব্যবস্থা, আইন প্রয়োগব্যবস্থা ইত্যাদি সমস্ত কিছুকে তারা প্রচণ্ড ঘৃণা করে এবং এগুলো ধ্বংস করতে চায়। যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, আইএস তাদেরকে ঘৃণার সঙ্গে বলে ‘ডেমোক্রেটিক প্যাগানস’। যেসব ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, পার্লামেন্টে যায় কিংবা সরকার গঠন করে, তাদের আইএস মুরতাদ, তাগুত ইত্যাদি নেতিবাচক বিশেষণে ভূষিত করে এবং তাদের ওপর আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করে। বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী কিংবা মিসরের ইসলামি ব্রাদারহুডের মতো রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের কাছে ‘মুরতাদ দল’। কারণ, এই সব দল নির্বাচনে অংশ নেয়।

ভাবাদর্শ ও সামাজিক দিক থেকে আইএস প্রচণ্ড কট্টরপন্থী। তারা নারীদের লেখাপড়া ও চাকরি করা বন্ধ করতে চায়। নারীদের ঘরের বাইরে রাস্তাঘাটে চলাফেরার অধিকারও তারা ভীষণভাবে সংকুচিত করতে চায়। সব নারীকে আপাদমস্তক আবৃত রাখতে চায়। মানুষ হিসেবে নারীদের কোনো অধিকার তারা স্বীকার করে না।

আইএসএর ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিও অত্যন্ত সংকীর্ণ ও সর্বোচ্চ মাত্রায় কট্টর। তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ইত্যাদি মুসলিম সম্প্রদায়ের বাইরে নানা জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। বাংলাদেশে হত্যা করেছে কয়েকজন পুরোহিত, যাজক ও ভিক্ষুকে।

আইএস ইসলামের বিভিন্ন ধারাকে অস্বীকার করে ‘সালাফি’ ধারাকেই একমাত্র সত্য বলে মনে করে এবং এই ধারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় তারা ইসলামের অন্য সব ধারার অনুসারী মুসলমানদের ওপর বলপ্রয়োগের নীতিতে বিশ্বাস করে। মুসলমানদের মধ্যে তাদের সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষ শিয়া সম্প্রদায়ের প্রতি। ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস বিপুলসংখ্যক শিয়া মুসলমানকে হত্যা করেছে, শিয়া ইমামদের অনেক মাজার বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে। সবশেষ ঈদুল ফিতরের এক দিন আগে তারা বাগদাদের শিয়া-অধ্যুষিত এক এলাকার বিপণিবিতানে বোমা হামলা চালিয়ে প্রায় ৩০০ শিয়া মুসলমানকে হত্যা করেছে। কয়েক দিন আগে আফগানিস্তানের আফগানিস্তানের কাবুলেও তারা বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে ৮৪ জন শিয়া মুসলমানকে হত্যা করেছে। আমাদের দেশে তারা আশুরার রাতে ঢাকার হোসেনি দালানে সমবেত শিয়া মুসলমানদের ওপর বোমা হামলা চালিয়েছিল। শুধু শিয়া নয়, একমাত্র সালাফি ছাড়া ইসলামের অন্য সব ধারার অনুসারী সমস্ত মুসলমানকেই আইএস নিজেদের শত্রু মনে করে।

এভাবে দেখা যাচ্ছে, গোটা পৃথিবীকেই আইএস নিজের শত্রু মনে করে, ভাবাদর্শের দিক থেকে তাদের কোনো মিত্র নেই। তথাকথিত ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে যে আরও একটি সশস্ত্র সংগঠন, সেই আল-কায়েদাকেও আইএস মিত্র বলে মনে করে না। বরং আল-কায়েদার নেতা-কর্মীদের নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করে এবং এই দুই সংগঠনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা রয়েছে বলে কোনো কোনো পর্যবেক্ষক লিখেছেন। আইএসএর সঙ্গে আল-কায়েদার দ্বন্দ্বের পেছনে রয়েছে তথাকথিত ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধ।

অর্থাৎ, আইএস সম্পূর্ণ একা। সালাফি মতাদর্শে বিশ্বাসীরা ছাড়া তাদের আর কোনো মিত্র নেই। তথাকথিত ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে তারা গোটা পৃথিবী ও মানবজাতির বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছে, সেই যুদ্ধে তাদের জয়ী হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই যে নেই, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এ রকম নিঃসঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন একটা অতি উগ্র সহিংস সংগঠন কীভাবে বিশ্বের দেশে দেশে তরুণসমাজের একটা অংশকে আকৃষ্ট করতে পারে, কেন তাদের জ্বালানো অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তরুণেরা ছুটে যাচ্ছে, তা এক গভীর রহস্য।