

কুষ্টিয়া অফিস, গড়াইনিউজ২৪.কম:: নাম বিথী খাতুন। কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলার কালুয়া নামক একটা প্রত্যন্ত গ্রামে আমার বাড়ি। বাবা- মা, ছোট ভাই এবং দাদীকে নিয়ে আমাদের সংসার।
তখন আমি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। আমার বাবা খুব অসুস্থ হয়ে ৩ বছর বিছানা থেকে নিজে উঠতে পারতোনা। দেড় লক্ষ টাকায় জমি বন্ধকি রেখে এবং ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা লোন নিয়ে বাবার চিকিৎসা চলতে থাকে। কিন্তু ৩ বছরের মধ্যে বাবার শারিরিক অবস্থার কোন উন্নতি হয়নি।
আমাদের চাচা, কিংবা মামারাও সামান্য সহোযোগিতা করে মুখ ফিড়িয়ে নেয়। কেউ আর আমাদের খোজ নেবার প্রয়োজনটুকুও মনে করেনা। মাঝে মাঝেই আমার বাবার মৃত্যুর গুজব রটে এলাকাতে। সবাই ভাবলো আমার বাবা এই অবস্থা থেকে ফিরে আসতে পারবেনা। তাই কেউ আমার মাকে ধারও দিতোনা কোন কিছু। আমরা এক বেলা কোনমতে ভাত খেয়ে কিংবা না খেয়ে দিনরাত কাটাতে লাগলাম।
আমি তখন মাত্র অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। এবং আমি খুবই সহজসরল প্রকৃতির ছিলাম। কিন্তু সংসারের এই পরিস্থিতি দেখে আমার খুব কষ্ট হতো। তাই আমি আমার পাড়াতে বাচ্চা ছেলেমেয়েদের বিনা টাকায় পড়াতে শুরু করি। প্রথমে ১-২ জন করে আস্তে আস্তে স্টুডেন্ট বাড়তে লাগলো। কারণ আমার এলাকাতে তখন তেমন কেউ পড়াতোনা। স্টুডেন্ট বাড়ার সাথে সাথে কিছু স্টুডেন্টের মা বাবারা আমাকে মাসে ৫০ টাকা করে মাসে দিতে শুরু করলো। কারো বাবা টাকা না দিয়ে কিছু কিছু মাছ দিয়ে যেতো। আমি কারো কাছে চেয়ে কখনো টাকা নেয়নি। আমার স্টুডেন্টদের স্কুলের রেজাল্ট ভালো হতে শুরু করলো এবং আমার নামও এলাকাতে মোটামুটি পরিচিত হলো যে ঐ মেয়েটা ছোট হলেও বাচ্চাদের খুব ভালো পড়ায়। তখন ১০০ টাকা করে বেতন দিতে থাকেন অভিভাবকরা। এভাবেই প্রতিমাসে ২৫০০-৩০০০ টাকা আয় হতে থাকে আমার। শুধুমাত্র এই টাকা দিয়েই আমাদের সংসার টেনেটুনে চলে যায়। আমি এসএসসি পরীক্ষা দেয়। স্কুলে আমি দিতাম হাফ বেতন কিন্তু ফরমপুরণ করেছিলাম মানুষের দানের টাকা দিয়ে। বাচ্চা পড়ানো দেখে খুশি হয়ে আমাদের বাড়ির পাশের প্রাইমারি স্কুলে প্রধান শিক্ষক জলিল স্যার আমাকে তার স্কুলে ১০০০ টাকা বেতনে প্যারা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। এই ১০০০ টাকায় তখন আমার কাছে অনেক কিছু ছিলো। আমি ক্লাস নিতে থাকি, সব স্যারই আমার উপর দারুন খুশি ছিলো। আমি পড়াশোনা বাদে সবকিছুতেই কম বুঝতাম। এতটা অভাবে থাকতাম তবুও ক্লাসের জরিমানার টাকাটা স্টুডেন্টদের কাছে থেকে নিয়ে ম্যাডামকে দিয়ে দিতাম না বুঝে, অবশ্য ওটা আমার প্রাপ্য ছিলো এখন বুঝি।
প্রতিদিন প্রায় ১০০ টাকার বেশি উঠতো। এবং তারা প্রচুর কাজ করাতো আমাকে দিয়ে, তবুও করতাম সংসারের হাল ধরে। এভাবেই এইসএসসি পাশের আগে পর্যন্ত স্কুলে ক্লাস নিচ্ছিলাম। কলেজে অবশ্য আমি খুব কমই গিয়েছি এসব কারণ। তবুও রাত ৩ টায় উঠে পড়ার অভ্যাস সেই স্কুল জীবন থেকে। এভাবেই ইন্টার পাস করলাম।
বিশ্ববিদ্যালয় কি তার নামও আমি কোনদিন শুনিনি ইন্টার পাশের পড়েও। কিন্তু কুষ্টিয়া কলেজে অনার্স বা ডিগ্রি পড়া যায় বলে আমার এক গ্রামের কাকা বলল। এবং সে বলল যে ডিগ্রি পড়লে খরচ অনেক কম। তুই অনার্স না পড়ে ডিগ্রি পড়। আমি গ্রামের একজন মানুষের সাথে এসে একদিন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ডিগ্রি ভর্তি হয়ে গেলাম। এবং গ্রামে বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়ানো চালিয়ে যাচ্ছিলাম। একজন আমাকে বলল যে শহরে যেয়ে পড়াশোনা করলে সরকারি প্রাইমারি স্কুলে চাকরি হয়। তার জন্য কম্পিউটার চালানো শেখা লাগে, না হলে সরকারি চাকরি হবে না। আমার কিছু চিনিনা বুঝিনা বাট এটা বুঝেছি যে আমাকে সরকারি চাকরি করতেই হবে। আমার বাবা মায়ের পাশে দাড়াতেই হবে। আমার ছোট ভাইটাকে যে করেই হোক পড়ালেখা করাতেই হবে। তাই আমি শহরে এসে কম্পিউটার শেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার গ্রামের বহুলোক আমার অসুস্থ বাবাকে নিষেধ করলো মেয়েকে শহরে না পাঠিয়ে বিয়ে দিয়ে দেবার জন্য। কারণ আমাদের গ্রামে ৮ থেকে ৯ ক্লাস পড়লেই বিয়ে দিয়ে দেয়। আমার বাবা অসুস্থ ছিলো তাই আমার বিয়ে হয়নি। যাই হোক আমি বাবার কথা না শুনে শহরে চলে এলাম। শুধু আমার মা আমার শহরে আসাতে রাজি হলো – কারণ আমি সরকারি চাকরি পাবো তাই। মা আমার সাথে কুষ্টিয়াতে আসলো। আমার কিছু জমানো টাকা, সাথে মায়ের মুরগি বিক্রির টাকা সহ মোট ৩৫০০টাকা।
আমি আর মা মেস খুজছি। মেস পেলাম হসপিটাল মোড়, টালিপাড়তে, ভাড়া ৬০০ টাকা। এসে একজন দালালের মাধ্যমে প্রথম ১৫০০ টাকা দিয়ে নটামস নামক একটা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হলাম। কলেজ মোড় থেকে রেল স্টেশন যেতে পড়ে নটামস। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে সব শেখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। এবং বাকি টাইমটা আমি মেসে এসে কাটিয়ে দিচ্ছি দুশ্চিন্তায়, আগামীমাসের বেতন দিবো কি করে মেসে এবং নটামসে। কলেজে যেতে হবে কি না সেটাও আর আমি খোঁজ নিইনি ভর্তির পড়ে। আমার চিন্তা চাকরি কি করে পাবো, পরের মাস কেমনে চলবো। একদিন মেসের এক আপুকে বললাম আপু আমি চাকরি করতে চাই কি করে কি করবো বলুন তো? তিনি হেসে বললেন তোকে কে চাকরি দিবে। এবং বললেন কম্পিউটারের দোকান থেকে সিভি তৈরি করে কোচিং সেন্টারগুলোতে দে, দেখ কি হয়।
আমার কাছে ১৫০ টাকা ছিলো ৫০ টাকা দিয়ে রেললাইন পুড়াতন বইযের ওখানে নায়েব ভাইয়ার কম্পিউটারেন দোকানে যেয়ে সিভি করলাম। ও আমি কুষ্টিয়া এসে তখনো একদিনের জন্যও রিকশাতে চড়ি নাই। এবার আমি হেটে হেটে অনেকগুলো কোচিং সেন্টারে সিভি জমা দিয়ে আসলাম। একেবারেই অচেনা অলিগলি পার হয়ে। এবার বকচত্তরে নলেজ কোচিং সেন্টারে আমার কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে ২০০০ টাকা বেতনে চাকরি হলো। অবশ্য মাস শেষে ১০০০ টাকা করে দিতো। আমি কি বোকা ছিলাম কোনদিন চাইনি। আর কোচিং পরিচালকের মেয়েকে পড়ানোর জন্য মাসে ৫০০ টাকা দিতো একজন অমানুষ কোচিং পরিচালক। এবার নলেজ কোচিংয়ের ই আরেক পরিচালক ডঃ জাহিদুর রহমান, উনি আবার র্যাবগলিত ঝিনাইদহ ক্যাডেট একাডেমি নামক একটা কোচিং কাজ করার সুযোগ দিলেন। এভাবেই চলছিল বাট টাকায় পারছিলাম না। মাসে বাড়িতে ১৫০০ টাকা পাঠিয়ে আমার থাকতো ১৮০০ টাকার মতো। এবার হসপিতাম মোড়োই ৪০০ টাকা ভাড়াতে একটা মেসে উঠলাম। এভাবেই চলছিল কিন্তু নলেজ কোচিংয়ের কিছু স্যার আমাকে এমন সরল সোজা দেখে হেল্প করার চেষ্ট করতো যেকোন ভাবে। নলেজের মেহেদী স্যার, টিপু স্যার, বাবুল স্যার, অনেক সাধারণত শিক্ষকই।
গত ২ বছর আগে একদিন এই রমজান মাসের ঘটনাঃ
এ যাবতকালে আমার মুখের উপর সত্য কথা বলাতে সবাই অবাক হতো। আসলে আমি বুঝতেই পারতামনা যে কিছু কথা মিথ্যা হলেও বলতে হয় সম্মান বাঁচাতে।বাট এ যে আমার কমনসেন্সের অভাব সেটা কেউ কোনদিন বুঝতে পারেনি। আমি কোখনোই কোন কথা মিথ্যা বলিনি। সেদিন মেহেদী স্যার এবং টিপু স্যার নাকি এক জায়গায় বসে আমাকে ফোন দিয়ে বলেন ইফতার করছো?? আমি বলেছিলাম জি স্যার করছি। বললো কি দিয়ে? আমিঃ আম এবং পানি দিয়ে। তারা তখনই জোর করে আমাকে মুড়ি, চানাচুর, পটেটো কিনে দিয়ে যান। অবশ্যআমি নিজে কারো দানের জিনিস পারতে পক্ষে নিইনা, জোর করেই দিয়েছেন তারা। এবং আমার এসব সততা এবং কষ্টকর লাইফ দেখে তারা আমাকে বলে তুমি রান্না করে দিতে পারলে একটা রেস্টুরেন্ট করতে পারি আমরা।আমি বলি পারবো স্যার। তারা আমাকে আগেই ফেসবুক আইডি খুলে দিয়েছিল এবং খাওয়া দাওয়া রেস্টুরেন্ট নামে একটা অনলাইন রেস্টুরেন্ট চালু করি আমরা। স্যারদের প্রচেষ্টায় আমরা প্রথম দিনই অনলাইনে খাবারের অর্ডার পায়। স্যারেরা কোচিং ক্লাসের ফাকে ফাকে খাবার হোমডেলিভারি সার্ভিস দিতে লাগলো। তারা এতে যে কতটা লজ্জার মুখে পড়েছে পড়ে আমি জেনেছি। তারা একটি টাকাও নেয়নি লাভ থেকে। এখন আমাদের অনেক ভালো চলে রেস্টুরেন্টটা, কুষ্টিয়া শহরে আমার রেস্টুরেন্টে মনে হয় প্রথম অনলাইন রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্ট থেকে টাকা জমিয়ে রাখি কিছু, কিছু পরিবারকে দেয়।আর আমার পড়ালেখার খরচ মেটায়।এখন ভালোই চলছে – আমি আমার ভাইকে কুষ্টিয়া মুসলিম হাইস্কুলে সায়েন্স গ্রুপ ক্লাস নাইনে ভর্তি করেছি। এবং দুইভাইবোন বাসা নিয়ে থেকে লেখাপড়া করছি।ওহ বলতেই ভুলে গেছি- আমি নিজেও পরের বছর স্যারদের সহোযোগিতায় অনার্স বাংলা বিভাগে কুষ্টিয়া সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তি হয়েছি। এবার দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছি।মোটামুটি ভালোই চলে যায় আমার দিনগুলো। কিন্তু কষ্ট তো ভুলিনাই আমি না খেয়ে থাকার বেদনা কতটা। গরিবের জ্বালা আমি বুঝি। কারণ আমি যে তাদের দলেরই লোক। তাই রেস্টুরেন্টের খাবার বেঁচে গেলে রেললাইনের পাশে অসহায়মানুষদের কিংবা বৃদ্ধদের আমি নিজে হাতে খাওয়ায়ে দিয়ে তৃপ্তি পেতাম। কুষ্টিয়ার মজমপুরে একজন হিন্দু ৮৫ প্লাস বয়সের বৃদ্ধাকে টানা ২ মাস প্রায় প্রতিদিন নিজে হাতে আমার রেস্টুরেন্টে খাবার খাওয়াতাম। এসব সেবা মুলক কাজ যখন সুযোগ পেয়েছি তখননই করেছি। আর গ্রামের একজন বৃদ্ধা পাড়াতো দাদীকে ক্লাস টেন এ থাকতে ২ বছর নিজে হাতে খাওয়ানো কিংবা প্রসাব,পায়খানা পরিস্কার সবই করতাম নিজ হাতে। আমার মা, চাচীরা রাগ করলে বাদ দেয়নি একদিনও।এটা আমার তৃপ্তির জায়গা।আর আমার কোন ঘৃনা করে না বৃদ্ধ মানুষের নিয়ে। আমার গ্রামের পাড়াতে গেলে এসব গল্প শুনতে পেতেন ভাইয়া মানুষের কাছে। নিজে মুখে বলতে কেমননি লাগছে।
শিক্ষানন্দঃ এবার আসি শিক্ষানন্দ ফাউন্ডেশন নিয়ে। আমরা সবাই যেহেতু মানুষকে কিছুনা কিছু হেল্প করতে চেষ্টা করি। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম একট ফাউন্ডেশন করবো আমরা। আমাদের মন থাকলেও যেহেতু নিজেদের ওতটা সামর্থ্য নেই।তাই আমরা সেই কলিগরা মিলে প্রতিষ্ঠা করি শিক্ষানন্দ নামক এই ফাউন্ডেশন। আমি এই সংগঠনের সহপ্রতিষ্ঠাতাএবং নির্বাহী পরিচালক।শিক্ষানন্দ এর সকল কিছু আমিই পরিচালনা করে থাকি মুলত। আর্থিক সহোযোগিতায়ঃ বাংলাদেশের সুনাগরিকগণ ১লা এপ্রিল থেকে আমরা শিক্ষানন্দ এর মাধ্যমে অসহায় ছিন্নমূল মানুষের জন্য কাজ করছি। খাবার রান্না করে আমরা পৌঁছে দেয় অসহায় মানুষের নিকট। মোটঃ ৩২৮০ জন মানুষের মাঝে আমরা খাবার বিতরণ করেছি।
গড়াইনিউজ২৪.কম/আরিফ
























