
আকাশে মেঘ জমেছে। মেঘের গায়ে লালচে আভা ! রোদ বৃষ্টির খেলা ! কোন মাস এটা ? শ্রাবণ মাস? নাহ,ভাদ্র কিংবা আশ্বিনের শেষ প্রায় ! শরৎ হেমন্তের সন্ধিক্ষণ ? সন্ধিলগ্নেই আবার একজনের বিদায়।শরৎ চলে যাবে ,হেমন্ত আসবে । তাই কি মেঘ আর রোদের এই লুকোচুরি খেলা ? হবে হয়তো ! এত কিছু আর ভাবতে পারছে না সে। কাল রাতে একেবারেই ঘুম হয়নি।
চোখ লেগে আসতেই দরজায় খুট খুট শব্দ। কে এত রাতে ! শব্দটা খুব আস্তে। মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে দিয়ে ক্রমাগত দরজায় নক করছে।কে হতে পারে ! ধীর পায়ে বিছানা ছেড়ে নেমে আসে নীরা। এই ফ্ল্যাটে উঠেছে সে বেশিদিন হয়নি। পড়াশোনা শেষ করে একটা চাকরিতে ঢুকেছে সবে। সাথে তার এক দূর সম্পর্কের বোন শিলা থাকে। বাবা মা,পরিবার থাকে মফস্বলে। বাবার সিদ্ধান্তেই এই ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়া হয়েছে। শিলা পড়াশোনার ফাঁকে কয়েকটা টিয়্যুশনি করে। আজ বিকেলে মেয়েটা হঠাৎ বাড়িতে গেল। মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে। সারা দিন কাজ করে বুয়া চলে যায় তার সময় মত। ভুল হয়ে গেছে, বুয়া কে বলা যেত আজ রাতটা যেন নীরার সাথে থেকে যায়।
থেমে থেমে দরজার খুট খুট শব্দ চলছে। নীরা এক গ্লাস পানি ঢেলে দেয় গলায়।কেমন যেন ভয় হলো। আজকাল কত কিছুই তো ঘটছে। নাহ! দরজা খুলবে না সে। যা হয় হবে। কিন্তু দরজা ধাক্কার গতি বাড়তে থাকে দ্রুত। এবার বুঝি না খুললেই নয়। খুব সন্তর্পনে সে আই হোলের এর ভিতর দিয়ে দেখার চেষ্টা করলো।কিছুই বুঝা যায় না। আরো জোরে অথচ খুব সাবধানে আবার দরজায় আঘাত পড়ল। এবার নীরা কথা বলে..
-কে….
-নীরা’ পু ! দরজা খোল ! আমি।
অনেকটা ফিসফিসানির মত করে কথা বলল কে যেন! অবাক হলো নীরা! কন্ঠস্বর চেনা চেনা লাগছে ওর নামও বলছে। আবার প্রশ্ন করে..
-কে….?
-আমি শিলা ,দরজা খোল নীরা ‘পু।
-আশ্চর্য ! শিলা ? কিভাবে ? দরজা খুলে দিল নীরা ।
-কিরে তুই না বাড়ি গেলি …
ভিতরে ঢুকলো শিলা , দ্রুত দরজা লাগিয়ে দিল। কিন্তু এ কি ! শিলার সাথে ভিতরে ঢুকলো আর একজন। কে এই যুবক ?
-আপু আমরা দুজন আজই বিয়ে করেছি।
নীরার চোখ কান যেন কিছুই দেখছেনা,শুনছেনা। এ কাকে দেখছে সে !
বাবার সরকারী চাকরীর সুবাদে নানা জায়গায় ছেলেবেলা কেটেছে তার। একবার এস এস সি পরীক্ষার পর দাদার বাড়িতে বেড়াতে গেল। লেখাপড়ার ঝামেলা মুক্ত হয়ে গ্রামের সবুজ সোনালী পরিবেশে বেশ লাগছিল। সোনালী ধানক্ষেতের দুলুনী ,পাখি ডাকা মৃদুলা হাওয়ার সাথে, গুনগুনা গানের সুরে মিশে যাওয়া মাতাল হাওয়ায় উড়ছে নীরার রেশমি চুল । শাপলা ফোঁটা পুকুরের জলে ঝিরিঝিরি বাতাসের ঢেউ খেলানির দিকে চেয়ে আছে, অপলক কাজল কালো চোখ দুটো। যে চোখে ছিল স্বপ্ন ,বিশ্বাস। ঠিক সেখানে, হ্যাঁ সেখানেই নীরার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে। অভিরূপ।
ও বাড়ির তারা ভাইয়ের বউ এর ছোট ভাই একদল বন্ধু নিয়ে গ্রামে বেড়াতে এসেছে। তাদের একজন অভিরূপ। নামের মতই তার কথাবার্তা চলন বলন সবই ছিল অন্যদের চেয়ে আলাদা। ধীরে ধীরে নীরার সাথে তার বন্ধুত্ব হয়। দাদীর বকুনি উপেক্ষা করে, পাখি ডাকা সবুজে ,কুলকুল করে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদীর ধারে, কাশবনের ধারে কেটেছে, কত বিকেল। নীড়ে ফেরা পাখিদের কিচিরমিচির শুনে গল্পে মেতেছে কত সন্ধ্যে।
তারপর একদিন ঘরে ফেরার পালা। অভিরূপ কোথায় থাকে, ,কি করে, কিছুই জানা হয় নি।যাবার সময় বলেছিল ,আমি তোমার সাথে যোগাযোগ করবো। তাদের ল্যান্ডফোনের নাম্বার দিয়েছিল। নীরা কিছুই বলতে পারে নি। শুধু মায়াভরা বোকা বোকা চোখ দুটো মেলে দেখছিল। সে চোখে কি জল ছিল? মনে নেই নীরার।
এরপর আর অভিরূপ কোনো যোগাযোগ করেনি । নীরা কতবার ভেবেছে, একবার কি ফোন করবে? নাহ ! সে তো একবারও চেষ্টা করেনি নীরার খোঁজ নেবার। কোনো বিপদ হয়নি ওর ? এরকম হাজার ভাবনার মাঝে আবার পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায় নীরা। মনের গহীনে থেকে গেল এক টুকরো স্মৃতি, এক বুক আশা।
অনার্স শেষ হবার পর থেকেই বিয়ের জন্য সমস্ত চাপ উপেক্ষা করেছে সে। বাবা মা কিছুতেই বিয়েতে রাজী করাতে পারেননি। মাস্টার্সের পর চাকরি নিয়ে সবার থেকে দূরে, অনেকটা নির্বাসনের মতই, আইবুড়ো মেয়ের অপবাদ মাথায় নিয়ে এই ফ্ল্যাটে এসে উঠেছে।
কিন্তু কেন? কি বোকা নীরা! অভিরূপ তো তাকে কোনো কথা দেয়নি ! কখনো বলেনি,সে নীরা কে ভালবাসে। তবে কেন নীরা এতকাল তার জন্য অপেক্ষা করেছে? মায়ের অসুস্থতার কথা বলে মিথ্যের আশ্রয়ই বা কেন নিল শিলা? কপালের দুই পাশের শিরা গুলো দপ দপ করছে।
-‘নীরা তুমি !’
নিরবতা ভাঙ্গে অভিরূপ। শিলার এসবে নজর নেই, সে খুব চিন্তিত।
-নীরা’পু ! মা’র অসুখের কথা বলে ওরা আমাকে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। আগামী কালই পানচিনি হবার কথা ছিল। আমি পালিয়ে এসেছি।
-তোরা হাত মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নে শিলা। বলে নিজের ঘরে যাবার জন্য পা বাড়াতেই ডাক দিল অভিরূপ।
শিলা দ্রুত ওয়াশ রুমের দিকে যায়।
যে কথাগুলো সে জানালো তার সংক্ষেপ হলো,অভিরূপ তার বন্ধুর সাথে বেড়ানোর ছুঁতোয় গ্রামে গিয়েছিল। অনেক চেষ্টা করেও নীরার দাদার সাথে দেখা করা বা নীরার সাথে যোগাযোগের কোনো মাধ্যম সে পায়নি।
এসবে নীরার এখন আর কিছুই যায় আসেনা।সব শুনে সে আশ্বস্ত করে অভিরূপকে।
-‘যা হবার হয়ে গেছে। তোমরা সুখী হও অভিরূপ।’
নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো।
ঘুম ভাঙ্গতে অনেক বেলা হয়ে গেছে। আজ অফিসে যায়নি সে। কাল গিয়ে ছুটির দরখাস্ত দিয়ে দিবে। লেকের পানির দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে নীরা। আবছা ছায়ার মত নিজের অবয়ব দেখছে। যেন পরাজিত এক প্রতিবিম্ব। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কলাবাগানের এই ফ্ল্যাট ছেড়ে দিতে হবে। বাসা খুঁজতে হবে অন্য দিকে, অন্য কোথাও।

–লেখক, কাওসার পারভীন

























