বৈধ পন্থায় বাংলাদেশে গরু রপ্তানি নিয়ে ভারতীয় সিদ্ধান্তে শাপে বর!

0
780

গড়াইনিউজ২৪.কম:: ২০১৫ সালের মার্চে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকা সফর করে গরু চোরাচালান বন্ধের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারির পর ভারত থেকে গরু আসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় বাংলাদেশে বেড়ে যায় গরুর মাংসের দাম। তবে ভারতের এই সিদ্ধান্তের পর গ্রামেগঞ্জে আগের মতো ব্যাপকভাবে শুরু হয়ে গেছে পশু পালন। গরিব মানুষের জন্য এটা সঞ্চয়েরও একটা সুযোগ। বছরজুড়ে পশু পেলে কোরবানিতে বিক্রি করে যে কয়টা টাকা পাওয়া যায় সেটাই পরিবারের আয় আর সঞ্চয়ের চিত্রটাই পাল্টে দেয়। ভারত থেকে যখন দেদারসে পশু আসতো তখন বরং এই আয় কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়তো বাংলাদেশের খামারিরা। আবার ভারতীয় পশুর দাম পাইকারিবাজারে তুলনামূলক কম থাকলেও ক্রেতাদের তাতে যে খুব একটা লাভ হতো তা নয়, ফটকা কারবারি আর মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে তখন যেত এই বাড়তি লাভ। আর ক্রেতারা এখনকার দামেই কিনতে বাধ্য হতো পশু। এই হিসাবে বাংলাদেশে পশু আসতে না দিতে ভারতীয় কঠোর নীতি বহুদিক থেকেই লাভ হয়েছে বাংলাদেশের। তবে বৈধ পন্থায় বাংলাদেশে কখনো গরু রপ্তানি করেনি ভারত। যা কিছু আসতো সব অবৈধ পন্থায়। কিন্তু এই চোরাচালানই দুই দেশ এক ধরনের বৈধতা দিয়েছিল। নানা পন্থায় সীমান্ত দিয়ে পশু দেশে আসার পর সীমান্তের বাজারে তুলে তা বিক্রি হতো। এরপর তা বৈধ হয়ে যায়। বিনিময়ে সরকারের কোষাগারে যোগ হতো একটি অংক। তবে গত কয়েক বছর ধরে এই ধারাবাহিকতাতেও ছেদ পড়েছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই গরু ‘রপ্তানি’ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। তবে ফাঁকফোকর দিয়ে যা কিছু গরু আসছে তা বাংলাদেশের চাহিদার তুলনায় বলতে গেলে কিছুই না। বছরজুড়ে তো বটেই কোরবানির পশুর একটি বড় চাহিদাও মেটাতো এই ভারতীয় পশু। এগুলোর সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে কী হবে, এ নিয়ে রীতিমত উদ্বেগ ছড়ায় দেশে। তবে দুই বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, ভারতীয় এই ‘নিষেধাজ্ঞা’ শাপে বর হয়েছে বাংলাদেশের জন্য। অন্যান্য অনেক হিসাবের মতো এ বিষয়েও সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে ধারণা করা হয় দুই বছর আাগেও কোরবানির পশুর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ আসতো ভারত থেকে। তবে এই ভারত নির্ভরতা কমে আসছে। এই হিসাবে এই মৌসুমে ভারতীয় গরু আসতো পাঁচ থেকে সাত লাখের মতো। সারা বছরের হিসাব করলে সেটা ১০ থেকে ১৪ লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো বলেই ধারণা প্রাণিসম্পদ বিভাগের। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অজয় কুমার রায় গড়াইনিউজ২৪.কম কে বলেন, এবারও আগেভাগেই খামারিরা জানতে পেরেছেন ভারতীয় গরু আসবে না। তাই তারা ভালো দামের আশায় গরু মোটাতাজাকরণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে দেশীয় জোগান এবার অন্যান্য বছরের চেয়ে কমপক্ষে দুই থেকে তিন লাখ গরু বেশি বাজারে উঠবে। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি পালন ও প্রজনন কর্মসূচির আওতায় জীবিকা নির্বাহ করে। জমিচাষ, ভারবহন এবং গোবরের সার ও জ্বালানি সরবরাহ প্রাণিসম্পদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তার ওপর, প্রাণীর চামড়া, হাড়, নাড়িভুড়ি ও পালক ইত্যাদি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সহায়ক। প্রাণিসম্পদ ভূমিহীন মানুষের জীবিকার একটা বড় অবলম্বন। কোরবানির আগে প্রতি বছরই পশু মোটাতাজা করার কাজ চলে সারা দেশে। চলতি বছর মোটাতাজা করা পশুর সংখ্যা অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, এবারের ঈদুল আজহায় কোরবানির জন্য এক কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার গরু ছাগল লালন পালন হচ্ছে। এর মধ্যে গরুর সংখ্যা ৪৫ লাখ এবং ছাগল ও ভেড়া ৭০ লাখ মতো। এই পরিমাণ পশু দিয়ে কি কোরবানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব? প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাব বলছে, সম্ভব। কারণ গত বছর দেশে কোরবানি হয়েছিল ৩৬ লাখ গরু। কোরবানির পর সংগ্রহ করা চামড়া গণনা করে এই তথ্য পাওয়া গেছে। চলতি বছর কোরবানির সংখ্যা ১০ শতাংশ বাড়লেও তা ৪০ লাখের কম হবে। আর ২০ শতাংশ বাড়লেও লালনপালন করা পশু দিয়ে সহজেই তা সামাল দেয়া যাবে বলে মনে করছে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। তবে চামড়া সংগ্রহের এই হিসাবের বাইরে আরেকটি বিষয় আছে। প্রতি বছরই বেশ কিছু চামড়া পাচার হয় ভারতে। পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হয় এই সংখ্যাটা কয়েক লাখ। এই হিসাবটা রাখলেও দেশের ভেতর লালনপালনকারী পশুর দিয়ে কোরবানির চাহিদা পূরণ খুব একটা সমস্যার হবে না বলে আশাবাদী প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবও বলছে, দেশে প্রতি বছর কোরবানির গরুর চাহিদা তৈরি হয় সর্বোচ্চ ৪০ লাখের মতো। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, গরু রপ্তানিতে ভারতে সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা বহাল আছে। তবে কোরবানির আগে কিছুটা শিথিল থাকে সীমান্তে বিএসএফের নজরদারি। ঈদের গরুর হাট বসা শুরু হলে সবার কাছে তা স্পষ্ট হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ